পৃথিবীর প্রথম সংবাদপত্র ১৫৬০ সালে জার্মান থেকে প্রকাশিত হয়। ১৭০২ সালে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হয় বিশ্বের প্রথম দৈনিক পত্রিকা। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ সরকার ১৭৯৫ সালে পত্র-পত্রিকায় প্রথম সেন্সর প্রথা চালু করে।
Key Notes:
- ভারতবর্ষের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্রের নামঃ জেমস্ অগাস্টাস হিকি সম্পাদিত 'বেঙ্গল গেজেট' (১৭৮০)। এটি ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়।
- বাংলা ভাষার প্রথম সাময়িকপত্র জন ক্লার্ক মার্শম্যান সম্পাদিত 'দিগদর্শন' (১৮১৮)।
- বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র জন ক্লার্ক মার্শম্যান সম্পাদিত 'সমাচার দর্পণ' (১৮১৮)। এটি সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হয়।
- বাঙালি কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য সম্পাদিত 'বাঙ্গাল গেজেট' (১৮১৮)।
- বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত 'সংবাদ প্রভাকর'। সাপ্তাহিক হিসেরে ১৮৩১ সালে এবং দৈনিক হিসেবে ১৮৩৯ সালে প্রকাশিত হয়।
- মুসলমান কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা শেখ আলিমুল্লাহ সম্পাদিত 'সমাচার সভারাজেন্দ্র' (১৮৩১)
- বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র গুরুচরণ রায় সম্পাদিত 'রংপুর বার্তাবহ' (১৮৪৭)।
- ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত 'ঢাকা প্রকাশ' (১৮৬১)।
সাময়িকী/সংবাদপত্র | প্রকাশকাল | সম্পাদক | টীকাভাষ্য |
| বেঙ্গল গেজেট | ১৭৮০ | জেমস অগাস্টাস হিকি | ভারতবর্ষের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র (ইংরেজিতে)। |
| দিগদর্শন | ১৮১৮ | জন ক্লার্ক মার্শম্যান | বাংলা ভাষার প্রথম সাময়িকপত্র। |
| সমাচার দর্পণ | ১৮১৮ | জন ক্লার্ক মার্শম্যান | বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র (সাপ্তাহিক)। |
| বাঙ্গাল গেজেট | ১৮১৮ | গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য | বাঙালি কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র। |
| সম্বাদ কৌমুদী | ১৮২১ | রাজা রামমোহন রায় | সামাজিক কুসংস্কার অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রকাশিত হত। |
| ব্রাহ্মণসেবধি | ১৮২১ | ||
| পশ্বাবলী | ১৮২২ | বেভারেন্ড লঙ | - |
| সমাচার চন্দ্রিকা | ১৮২২ | ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় | - |
| বঙ্গদূত | ১৮২৯ | নীলমণি হালদার | - |
| সংবাদ প্রভাকর (সাপ্তাহিক) | ১৮৩১ | ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত | বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র। |
| সংবাদ প্রভাকর (দৈনিক) | ১৮৩৯ | ||
| সমাচার সভারাজেন্দ্র | ১৮৩১ | শেখ আলিমুল্লাহ | মুসলমান কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা। |
| জ্ঞানান্বেষণ | ১৮৩১ | দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় | 'ইয়ংবেঙ্গল' গোষ্ঠীর মুখপত্র। |
| তত্ত্ববোধিনী | ১৮৪৩ | অক্ষয়কুমার দত্ত | তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র। |
| রংপুর বার্তাবহ | ১৮৪৭ | গুরুচরণ রায় | বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র। |
| ঢাকা প্রকাশ | ১৮৬১ | কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার | ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র। |
| গ্রামবার্তা প্রকাশিকা | ১৮৬৩ | কাঙাল হরিনাথ | কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র। |
| বঙ্গদর্শন | ১৮৭২ | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | বাংলা গদ্যের বিকাশে এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। |
| ভারতী | ১৮৭৭ | দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর | - |
| সুধাকর | ১৮৮৯ | শেখ আব্দুর রহিম | মুসলমানদের মহিমা, তত্ত্ব, জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয় এতে আলোচিত হতো |
| মিহির | ১৮৯২ | ||
| হাফেজ | ১৮৯৭ | ||
| কোহিনুর | ১৮৯৮ | মো: ইয়াকুব আলী চৌধুরী | কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র। |
| সবুজপত্র | ১৯১৪ | প্রমথ চৌধুরী | বাংলা সাহিত্যে চলিত রীতি প্রচলনে অবদান রাখে। |
| সওগাত | ১৯১৮ | মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন | ১৯২৬ সালে এটি সওগাত নবপর্যায় নামে প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৫২ সাল থেকে পত্রিকাটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। |
| মোসলেম ভারত | ১৯২০ | মোজাম্মেল হক | কাজী নজরুলের কাব্য খ্যাতিতে এটি অবদান রাখে। |
| আঙ্গুর | ১৯২০ | ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ | কিশোর পত্রিকা। |
| ধূমকেতু | ১৯২২ | কাজী নজরুল ইসলাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ পত্রিকায় অভিনন্দন বাণী পাঠিয়েছেন। |
| লাঙল | ১৯২৫ | - | |
| নবযুগ | ১৯৪১ | ১৯২০ সালে মুজাফফর আহমদ সহযোগে প্রথম প্রকাশিত। | |
| কল্লোল | ১৯২৩ | দীনেশরঞ্জন দাশ | এ পত্রিকাকে ঘিরে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যিক বলয় তৈরি হয়েছিল। |
| কালিকলম | ১৯২৬ | প্রেমেন্দ্র মিত্র | কলকাতা থেকে প্রকাশিত সচিত্র মাসিক পত্রিকা। |
| মাসিক মোহাম্মদী | ১৯২৭ | মো: আকরম খাঁ | - |
| শিখা | ১৯২৭ | আবুল হোসেন | 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের মুখপত্র রূপে প্রকাশিত। |
| পূর্বাশা | ১৯৩২ | সঞ্জয় ভট্টাচার্য | - |
| কবিতা | ১৯৩৫ | বুদ্ধদেব বসু | ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা। |
| দৈনিক আজাদ | ১৯৩৬ | মো: আকরম খাঁ | কলকাতা থেকে প্রকাশিত। |
| চতুরঙ্গ | ১৯৩৯ | হুমায়ুন কবির | ঢাকা থেকে প্রকাশিত। |
| ক্রান্তি | ১৯৪০ | রণেশ দাশগুপ্ত | ঢাকা থেকে প্রকাশিত। |
| বেগম (সাপ্তাহিক) | ১৯৪৭ | সুফিয়া কামাল (প্রথম), নুরজাহান বেগম | মহিলা সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা। |
| সমকাল | ১৯৫৭ | সিকান্দার আবু জাফর | তৎকালীন সময়ের ঢাকার প্রভাবশালী পত্রিকা। |
| কন্ঠস্বর | ১৯৬৫ | আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ | - |
| কালবেলা | ১৯৬৫ | জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত | - |
| স্বদেশ | ১৯৬৯ | আহমদ ছফা | - |
| শিলালিপি | ১৯৬৯ | সেলিনা পারভীন | - |
| শিল্পকলা | ১৯৭০ | আবদুল মান্নান সৈয়দ | - |
| কণ্ঠস্বর | - | আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ | - |
| উত্তরাধিকার | ১৯৭৩ | এটি বাংলা একাডেমি'র সৃষ্টিশীল সাহিত্যপত্র। ১৯৭৩ সালে মাসিক পত্রিকা হিসেবে চালু হলেও ১৯৮৩ সালে ত্রৈমাসিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। ২০০৯ সালে আবার মাসিক পত্রিকা হিসেবে নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। পরে আবারও ত্রৈমাসিকে রূপান্তরিত হয়। | |
| ধানশালিকের দেশ | ১৯৭৩ | এটি কিশোরদের জন্য প্রকাশিত বাংলা একাডেমি'র ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা। | |
| লোকায়ত | ১৯৯০ | ১৯৯০ সালে হুগলি জেলার শ্রীরামপুর স্টেশনের ডাউন প্লাটফর্মের হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকা 'লোকায়ত'র শুরু। ১৯৯২ সালে মুদ্রিত আকারে আত্মপ্রকাশ। | |
| নারীশক্তি | - | ডা. লুৎফর রহমান | নারী সমাজের প্রগতির লক্ষ্যে প্রকাশিত। |
| ইত্তেফাক | - | তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) | - |
| সাহিত্য পত্রিকা | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলা বিভাগ)। | ||
| ভাষা সাহিত্যপত্র | জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলা বিভাগ)। | ||
| সাহিত্যিকী | রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলা বিভাগ)। | ||
আধুনিক যুগের সূচনায় পত্র-পত্রিকার ভূমিকা:
বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের সূচনার অন্যতম অনুষঙ্গ ছিলো পত্র-পত্রিকা। আধুনিক যুগের প্রতিভূ হলো গদ্য সাহিত্য। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বিষয় ছিল ধর্ম অথবা রাজবন্দনা আর আঙ্গিকে ছিল কেবলই কবিতা। আর গদ্যের বিকাশের সাথে সাথে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূচনা ঘটে। শ্রীরামপুরের খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারকগণ ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষকবৃন্দ বাংলা গদ্যের উন্নতিকল্পে প্রভূত পরিশ্রম করে ভূমিকর্ষণ করেছিলেন। সেই কর্ষিত ভূমিতে ফসল ফলানোর উপযোগী আলো-হাওয়া ও জলসিঞ্চনের ব্যবস্থা করেছিল পত্র-পত্রিকাগুলো। এসব সাময়িকপত্র যদি যথাসময়ে গদ্যভাষার বাহন না হয়ে উঠতো, তাহলে বাংলা গদ্য সাহিত্য এতো দ্রুত সমৃদ্ধি লাভ করতো না এবং আধুনিক যুগের সূচনা আরও প্রলম্বিত হতো। তাই গদ্যরীতি গঠনে ও গদ্যসাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনে পত্র-পত্রিকার অবদান অনস্বীকার্য। বিভিন্ন পত্রিকাগোষ্ঠীকে অবলম্বন করেই সেকালে প্রতিভাবান সাহিত্যিকেরা জাতীয় সাহিত্যের ভান্ডার সমৃদ্ধ করে বাংলা সাহিত্যে নতুন রাগিণীর সূচনা ঘটান, যা আধুনিক যুগের সূচনাকে ত্বরান্বিত করে। ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে বাংলা মাসিকপত্র হিসেবে মিশনারিদের পক্ষ থেকে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় 'দিকদর্শন' প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকায় ব্যবহৃত গদ্যভাষা খুব স্বচ্ছন্দ না হলেও সহজবোধ্য ছিলো, যা গদ্য সাহিত্য বিকাশে ভূমিকা রাখে। ১৮১৮ সালের মে মাসে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় 'সমাচার দর্পণ' নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকার লেখার ভাষায় সারল্য, তথ্যবোধ ও মাত্রাজ্ঞান বিদ্যমান ছিল। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নববাবু বিলাস' ও 'নববিবি বিলাস', প্যারীচাঁদ মিত্র ও কালীপ্রসন্ন সিংহের লেখা 'বাবু-বৃত্তান্ত' এর সূচনা এ পত্রিকাতেই। ড. সুকুমার সেন বলেন, 'সাধারণ বাঙ্গালী পাঠক খবরের কাগজের রস এই প্রথম আস্বাদন করিল এবং তাহাতে বাঙ্গালা গদ্যের ঘরোয়া পরিচয়ের সুযোগ লাভ করিল। ………. এই সাময়িকপত্রের মধ্যে অনুশীলিত হইয়াই বাংলা গদ্যের জড়তামুক্তি ঘটিয়াছিল।' রাজা রামমোহন রায়ের সম্পাদনায় ১৮২১ সালে প্রকাশিত হয় 'সম্বাদ কৌমুদী' ও 'ব্রাহ্মণসেবধি' পত্রিকা। এ পত্রিকায় রামমোহন রায় ও অন্যান্য পণ্ডিতগণ লেখালেখি করতেন, যা বাংলা গদ্যসাহিত্য বিকাশের পথ খানিকটা অগ্রসর হয়। বাংলা গদ্য সাহিত্যকে শিশু থেকে যৌবনপ্রাপ্ত করার বিশেষ সহযোগী হিসেবে 'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকা ১৮৩১ সালে প্রথমে সাপ্তাহিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৮৩৯ সালে দৈনিকরূপে প্রকাশিত হয়। দীনবন্ধু মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ মূলত এ পত্রিকার মাধ্যমে শুরু হয়। এ পত্রিকা দীর্ঘকাল পাঠকের কাছে নানা ধরনের সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি সাহিত্যরস পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করে এসেছিল, যা গদ্যসাহিত্য পরিপূর্ণ বিকাশের পথে সবেগে ধাবিত হয়। এছাড়াও ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর 'জ্ঞানান্বেষণ', অক্ষয়কুমার দত্ত সম্পাদিত 'তত্ত্ববোধিনী', প্যারীচাঁদ মিত্রের 'মাসিক পত্রিকা', রাজেন্দ্রলাল মিত্রের 'বিবিধার্থ সংগ্রহ' প্রভৃতি পত্রিকা বাংলা গদ্যের বিকাশের পথকে মসৃণ করে এবং এর ফলে বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের সূচনাপর্বের সগৌরবে উন্মেষ ঘটে। পরবর্তীতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত 'বঙ্গদর্শন', দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত 'ভারতী' এবং সর্বশেষ প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত 'সবুজপত্র' পত্রিকা বাংলা গদ্যরীতির বিকাশের মাধ্যমে আধুনিক যুগের পূর্ণতা দানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
১৭৮০ সালে ২৯ জানুয়ারি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ভারতের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র জেমস অগাস্টাস হিকি সম্পাদিত 'বেঙ্গল গেজেট'। পত্রিকাটিতে মূলত বিজ্ঞাপন, বিদেশি ইংরেজি পত্রিকা থেকে উদ্ধৃতি, সংবাদদাতাদের বিবরণধর্মী লেখা ছাপা হতো। প্রকাশের প্রথম মাস দশেক কোন রাজনৈতিক বিবাদপূর্ণ লেখা প্রকাশিত হয়নি। পরবর্তীতে প্রশাসনের বিপক্ষে কিছু লেখা বের হলে ১৭৮০ সালের ১৪ নভেম্বর ফোর্ট উইলিয়াম থেকে এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে ডাকঘরের মাধ্যমে পত্রিকা বন্ধ করা হয়। পরে হিকি মামলায় জড়িয়ে পড়ে এবং ১৭৮২ সালে তাঁর ছাপাখানা আটক ও বিক্রি করে দেয়া হলে ভারতবর্ষের প্রথম সংবাদপত্রের অপমৃত্যু ঘটে।
১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে বাংলা মাসিকপত্র হিসেবে হুগলি জেলার শ্রীরামপুর মিশনারিদের পক্ষ থেকে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় 'দিকদর্শন' প্রকাশিত হয়। সংবাদ অপেক্ষা ধর্মীয় নীতিকথা ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তথ্য পরিবেশনই বেশি প্রাধান্য পেত। ২৬টি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর এ পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। নীতি ও ধর্ম শিক্ষা প্রচার করায় তৎকালীন সরকার এ পত্রিকার উপর সদয় ছিল। সে অর্থে এ পত্রিকা সংবাদপত্র হিসেবে নয়; নীতি-ধর্ম-তত্ত্বমূলক মাসিক সাময়িকপত্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
বঙ্গদর্শন উনিশ শতাব্দীতে প্রকাশিত একটি বাংলা মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বা সাময়িকপত্র। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম স্থপতি সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। রচনার মান, বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও রুচির দিক থেকে বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী পত্রিকা। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের মান এবং অনুশাসন এই পত্রিকার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতো।
১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। বিশুদ্ধ সাহিত্য রস পরিবেশনের উদ্দেশ্য নিয়ে পত্রিকাটির যাত্রা শুরু করেছিল। বঙ্কিম এর যাবতীয় চিন্তাভাবনা এই পত্রিকার মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের বেশকিছু উপন্যাস এই পত্রিকার প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর বিষবৃক্ষ, চন্দ্রশেখর, রজনী, কৃষ্ণকান্তের উইল, রাজসিংহ, আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরানী প্রভৃতি উপন্যাস এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এর লেখক গোষ্ঠীতে ছিলেন চন্দ্রনাথ বসু, রামপ্রসাদ সেন, অক্ষয় চন্দ্র সরকার, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ।
১২৭৯ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ (১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দ, ১২ এপ্রিল) তারিখে মাসিক বঙ্গদর্শন পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সে সময়ে অবিভক্ত বাংলায় কোনো উন্নত মানের সাময়িকপত্র ছিল না। ১২৭৯ বঙ্গাব্দের বৈশাখ থেকে ১২৮২ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাস অবধি এর সম্পাদক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রধান উপন্যাসগুলি এবং বহু প্রবন্ধ এখানে প্রকাশিত হত। ১২৮৩ বঙ্গাব্দে এর প্রকাশ স্থগিত থাকে। ১২৮৪ বঙ্গাব্দ থেকে পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশিত হয় সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায়। শ্রীশচন্দ্র মজুমদার ১২৯০ বঙ্গাব্দের কার্তিক থেকে মাঘ পর্যন্ত ৪টি সংখ্যার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৩০৮ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩১২ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় বঙ্গদর্শন নবপর্যায়ে ৫ বৎসর প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "চোখের বালি" উপন্যাস এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
১৮১৮ সালের মে মাসে হুগলি জেলার শ্রীরামপুর মিশনারির জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় 'সমাচার দর্পণ' নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। মার্শম্যান বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন না, এতে বাঙালি হিন্দু পণ্ডিতেরা লিখতেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জয়গোপাল তর্কালঙ্কার। সংবাদই ছিল এ পত্রিকার প্রাণ, তবে ধর্ম বা তত্ত্ব আলোচনাও থাকত। এ পত্রিকা কোনো ধর্মীয় বিতর্কে না গিয়ে খ্রিষ্টান মতবাদের প্রতি পক্ষপাত পোষণ করতো। এ পত্রিকার লেখার ভাষায় সারল্য, তথ্যবোধ ও মাত্রাজ্ঞান লক্ষ্যযোগ্য বিদ্যমান ছিল। এটি ১৮৪০ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
১৯২৩ সালে আধুনিক লেখকদের সাহিত্যিক মুখপত্র হিসেবে কলকাতা থেকে মাসিক 'কল্লোল' প্রকাশিত হয়। দীনেশরঞ্জন দাশ ছিলেন এর সম্পাদক। এটি রবীন্দ্র-রোমান্টিক সাহিত্যের বিরুদ্ধধারা হিসেবে আধুনিক সাহিত্যের সূচনা হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এ পত্রিকার লেখকগণ বয়সে তরুণ, সৃষ্টিতে কূলপ্লাবী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেতনা, ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রভাব এ তরুণ লেখকদের লেখনিতে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ ছিলেন এ পত্রিকার নিয়মিত লেখক।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
১৯৫৭ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকানদার আবু জাফর সম্পাদিত 'সমকাল' সমকালীন সময়ের প্রভাবশালী পত্রিকা। তৎকালীন পাকিস্তানে, বর্তমান বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্যের বীজতলা নির্মাণে 'সমকাল' পত্রিকার ভূমিকা অপরিসীম। ষাটের দশকের সকল সাহিত্যিক এ পত্রিকার লিখতেন। এ পত্রিকার হাত ধরেই অনেক সাহিত্যিক খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন বা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।
খ্রিষ্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা।
১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বঙ্গদূত পত্রিকা। প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ৯ই মে শনিবার। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন নীলমণি হালদার। কিছুদিন পর, নীলরত্ন অবসর গ্রহণ করেন। ফলে নতুন সম্পাদক পরিচালক হন ভোলানাথ সেন। ভোলানাথের মৃত্যুর পর মহেশচন্দ্র সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। এর কিছু সংখ্যা প্রকাশের পর, পত্রিকাটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। তবে শেষ সংখ্যা কবে প্রকাশিত হয়েছিল, তা জানা যায় নি।
সূত্র :
বাংলা সাময়িক সাহিত্য (১৮১৮-১৮৬৭)। শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশ্বভারতী। ১৯৬৪।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত 'সবুজপত্র' বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ১৯১৪ সালে এর প্রথম প্রকাশ ঘটে। বাংলা গদ্যরীতির বিকাশে এই পত্রিকার গুরুত্ব অপরসীম। সাধু গদ্যরীতির পরিবর্তে চলিত গদ্যরীতি ব্যবহার ও প্রতিষ্ঠায় এটির অবদান তাৎপর্যপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এই পত্রিকায় লেখার সুবাদে চলিত গদ্যরীতির স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন এবং পরে তা তিনি চর্চা করেন। প্রমথ চৌধুরী 'বীরবলী রীতি' নামে যে মৌখিক ভাষারীতি সাহিত্যে প্রচলন করে যুগান্তর এনেছিলেন তার প্রচারের মাধ্যম ছিল এই সবুজপত্র। সাহিত্যজগতে এ পত্রিকা 'সবুজপত্র গোষ্ঠী' তৈরি করতে সক্ষম হয়।
কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় ১৯২২ সালে অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা 'ধূমকেতু' প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির প্রকাশনা উপলক্ষ্যে আশীর্বাদ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন "কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু। আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।” এ মন্তব্যটি পত্রিকার পাতার শীর্ষে লেখা থাকতো। নজরুল এ পত্রিকায় দেশের মুক্তির দিশারী হিসেবে 'অনুশীলন' ও 'যুগান্তর' দলের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনকে উৎসাহ প্রদান ও ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করে বহু অগ্নিঝরা সম্পাদকীয়, কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯২২ সংখ্যায় নজরুলের 'আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতাটি প্রকাশিত হলে ৮ নভেম্বর পত্রিকার উক্ত সংখ্যাটি ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২৩ নভেম্বর, ১৯২২ সালে 'যুগবাণী' প্রবন্ধগ্রন্থ নিষিদ্ধ হলে নজরুল গ্রেফতার হন এবং ১৬ জানুয়ারি, ১৯২৩ সালে এক বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ফলে নজরুলের অনুপস্থিতিতে বীরেন সেনগুপ্ত ও অমরেশ কাঞ্জিলালের সম্পাদনায় কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশিত হলেও মার্চ, ১৯২৩ সালে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলা গদ্য সাহিত্যকে শিশু থেকে যৌবনপ্রাপ্ত করার বিশেষ সহযোগী হিসেবে 'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকার ভূমিক উল্লেখযোগ্য। এটি ১৮৩১ সালে প্রথমে সাপ্তাহিক হিসেরে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৮৩৯ সালে দৈনিকরূপে প্রকাশিত হয়। দীনবন্ধু মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ মূলত এ পত্রিকার মাধ্যমে শুরু হয়। এছাড়াও বহু খ্যাতনামা ব্যক্তি (জয়গোপাল তর্কালঙ্কার, প্রসন্নকুমার ঠাকুর) এ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। 'সংবাদ প্রভাকর' বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক।
বিশ শতকের প্রারম্ভে বাংলা সাহিত্যে কল্লোল গোষ্ঠীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ২৬ জুলাই, ১৯২৪ সালে যোগানন্দ দাস সম্পাদিত হাস্যরসাত্মক ও তীর্যক মন্তব্যধর্মী সাহিত্য পত্রিকা 'শনিবারের চিঠি' প্রকাশিত হয়। ১৯২৭ সালে সজনীকান্ত দাস এ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। হাস্য-কৌতুক ও তীর্যক মন্তব্যের মাধ্যমে এ পত্রিকা সমকালীন কবি ও সাহিত্যিকদের লেখা নিয়ে প্যারোডি বা কার্টুন প্রকাশের মাধ্যমে রসিকতা করতো। কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' কবিতারও প্যারোডি প্রকাশ করেছে এ পত্রিকা। পত্রিকাটির বিশিষ্ট লেখকরা ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অশোক চট্টোপাধ্যায়, সুবিমল রায়, মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস, যোগানন্দ দাস, নীরদচন্দ্র চৌধুরী প্রমুখ।
Read more